ঘরের কাজ শরীরের পক্ষে কতটা উপকারী?

0
ঘরের কাজ করে কীভাবে উপকার পাওয়া যায়?
 ঘরের কাজ করলে শারীরিক পরিশ্রম হয়। এক্ষেত্রে শারীরিক পরিশ্রমকে পরোক্ষ ব্যায়াম হিসেবে বিবেচনা করাই যায়। আর ব্যায়ামের সহজ অর্থ হল ব্যারাম থেকে মুক্তি। এই যুক্তিতে বলাই যায় যে শরীর সুস্থ রাখতে ঘরের কাজ করা বেশ উপকারী।
ঘর মোছা, বাসন মাজা, কাপড় কাচা সহ আরও একাধিক কাজ থাকে ঘরে। এই প্রতিটি কাজেরই নিজের মতো করে শরীরের ওপর সুপ্রভাব রয়েছে।
ঘর ঝাড় দেওয়ার সময় শরীর সামনের দিকে ঝোঁকাতে হয়। এরফলে পিঠ, কোমর, পেটের এবং পায়ের বৃহৎ অংশের পেশির সঞ্চালন হয় এবং রক্ত সঞ্চালন বাড়ে  বাসন মাজা, সব্জি কাটা, রান্না করার, রুটি বেলা, আটা-ময়দা মাখার সময় হাতের ও কাঁধের বিভিন্ন মুদ্রা অর্থাৎ ব্যায়াম হয়  কাপড় কাচার সময় হাতের একটা বৃহৎ অংশের সঞ্চালন ঘটে  বেশিরভাগ মানুষই উবু হয়ে বসে ঘর মোছেন। এভাবে বসলে পায়ের এবং পেটের ব্যায়াম হয়। আবার ঘর মোছার একটি মানসিক দিকও রয়েছে। ঘর মোছার সময় মানুষ সাধারণত সামনে থেকে পিছনের দিকে আসেন। ফলে ঘরের পিছনের দেওয়ালের সঙ্গে নিজের দূরত্ব সম্বন্ধে ধারণা করে নিতে হয়। মুছতে মুছতে সেই হিসেব করেই পিছনে আসতে হয়। এরফলে মস্তিষ্কের অনুমান ক্ষমতা বাড়ে।
 কী কী শারীরিক এবং মানসিক উপকার হয়?
 ঘরের কাজ করলে কিছুটা ব্যায়ামের মতোই উপকার পাওয়া যায়। শারীরিক সুফলের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল শরীরে রক্ত সঞ্চালন ব্যবস্থাকে সচল রাখে, ইমিউনিটি বাড়ায়, ওজন কমায়, চামড়া টানটান দেখায়, অকাল বার্ধক্য আটকায়, পেটের সমস্যা কমে, সর্দি-কাশি-জ্বরে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা কমে, ফুসফুসের জোর বাড়ে। মানসিকভাবে মনোঃসংযোগ ও স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধি পায়। ভালো থাকার অনুভূতি হয়।
 ঘরের কাজ থেকে সর্বাধিক উপকার পেতে কোন কোন বিষয়ে খেয়াল রাখতে হবে?
 সবার প্রথমে ঘরের কাজকে সাধারণ কাজ ভাবাটা বন্ধ করতে হবে। মনে মনে ভাবতে হবে, আমি ঘরের কাজও করছি, আবার শরীর চর্চাও করছি। কাজের মধ্যেই মনের আনন্দ খুঁজে নেওয়া দরকার।
মনে রাখবেন, প্রথম দিনই বেশি কাজ করতে যাওয়া উচিত হবে না। নিয়মিত অভ্যেস করতে হবে। ধীরে ধীরে কাজের বহর বাড়ানো যায়। প্রথম দিকে নিজের কাজ নিজে করার চেষ্টা করুন। এরপর সয়ে গেলে বাড়ির অন্যান্য কাজও শুরু করতে পারেন। এক্ষেত্রে কোনও নির্দিষ্ট সময় ধরে কাজ করার কোনও নিয়ম নেই। যতক্ষণ ভালোবেসে কাজ করা যাচ্ছে, করাই যায়।
 বাড়ির কাজ করলে কি আলাদা করে ব্যায়াম করার প্রয়োজন রয়েছে?
 না, শুধু কাজের সঙ্গে ব্যায়ামের তফাত রয়েছে। কাজ করার সময় মানুষ কাজটিকে শেষ করার বিষয়ে বেশি মনোযোগ দেন। কিন্তু ব্যায়ামের ক্ষেত্রে মনের সঙ্গে কাজের মিলন ঘটাতে হয়। একটি উদাহরণ দিলে বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যাবে। ধরুন কোনও ব্যক্তি প্রতিদিন একটি জলের বালতি এক জায়গা থেকে তুলে নিয়ে অন্য জায়গায় রাখেন। এটা করার সময় তিনি শারীরিক পরিশ্রম করছেন। কিন্তু এর থেকে ব্যায়ামের সমান সুফল পাওয়া যাবে না। এবার প্রশ্ন হল, শারীরিক পরিশ্রম করার পরও এই কাজ করে ব্যায়ামের সমান সুফল পাওয়া যায় না কেন? এর সহজ উত্তর হল, তিনি কাজটি করার সময় এটাকে সাধারণ কাজ হিসেবেই চিন্তা করেন। কাজটি করার সময় তাঁর লক্ষ্য থাকে শুধু বালতিটিকে এক জায়গা থেকে তুলে নির্দিষ্ট জায়গায় রেখে দেওয়া। এই কাজটির সঙ্গে তিনি মানসিকভাবে একাত্ম হতে পারেন না। আবার কাজটি করে শরীরের কিছু ভালো হতে পারে বলেও তিনি বিশ্বাস করেন না। তাই কাজটির সম্পূর্ণ সুফলও সেই ব্যক্তি পাবেন না। অথচ একই কাজ করার সময় কাজটির শারীরিক সুফলগুলি মাথায় রেখে করলে আরও বেশি উপকার পাওয়া যায়।
ঠিক এই জায়গাতেই আসে ব্যায়ামের গুরুত্ব। ব্যায়াম করার সময় আমরা ভালো থাকার কথা চিন্তা করি। ব্যায়ামের সঙ্গে একাত্ম হয়ে যাই। তাই আর পাঁচটা সাধারণ কাজের থেকে ব্যায়াম অবশ্যই আলাদা।
এছাড়াও ব্যায়ামের একটি নির্দিষ্ট ছন্দ রয়েছে। প্রতিটি ব্যায়াম নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে করতে হয়। সেদিক থেকে ঘরের কাজে তেমন কোনও নিয়ম বা ছন্দ নেই বললেই চলে। এই যুক্তিতেও ঘরের কাজগুলির থেকে ব্যায়াম অনেকটাই এগিয়ে। সবদিক বিবেচনা করে বলাই যায় যে বাড়ির কাজগুলি কোনওভাবেই ব্যায়ামের সম্পূর্ণ বিকল্প নয়। তাই বাড়ির কাজ করার পরও সময় বের করে ব্যায়াম এবং প্রাণায়ম করুন।
তবে যে কোনও কাজেই অল্প বিস্তর শরীর চর্চা হয়। সেদিক থেকে একান্তই ব্যায়াম করার সময় না থাকলে অন্তত বাড়ির কাজ করা যেতেই পারে।
 কোন অসুখে কোন কোন ঘরের কাজ একদমই করা উচিত নয়?
 এক্ষেত্রে প্রথমেই ব্যাথার প্রসঙ্গ আসবে। কোমরে, পায়ে, হাঁটুতে ঘাড়ে, পিঠে ব্যথায় অবশ্যই বেশি ঝুঁকে কাজ করা থেকে বিরত থাকতে হয়। এমন সমস্যায় আক্রান্তরা ঝুঁকে ঘর মোছা, ঘর ঝাড় দেওয়ার কাজ না করাই ভালো। ঘাড়ে বা হাতে ব্যথা থাকলে কাপড় কাচার অভ্যেস ছাড়তে হবে। উচ্চ রক্তচাপ এবং হার্টের রোগে অবশ্যই ভারী ওজন তোলা যাবে না। ঠিক তেমনই কোনও রোগের অ্যাকিউট অবস্থায় যেমন জ্বর-জ্বালা, ইনফেকশন ইত্যাদিতে সাময়িকভাবে কাজ করা থেকে বিরত থাকতে হবে। পাশাপাশি সার্জারি পরেও কিছুদিনের জন্য বাড়ির কাজ না করাই শ্রেয়।
কিন্তু সমস্যা যাই থাকুক, খুব বেশিদিন বাড়ির কাজ না করার কোনও যুক্তি নেই। তার বদলে প্রযুক্তির সাহায্য নেওয়া উচিত। একটি উদাহরণ দেওয়া যাক। যেমনটা বলা হল, ঘাড়ে, পিঠে, হাঁটুতে ব্যথায় ঝুঁকে কাজ না করাই ভালো। এক্ষেত্রে কোনও ব্যক্তি এটাকে অজুহাত হিসেবে খাড়া করে ঘরের কাজ না করতেই পারেন। অথচ প্রযুক্তির সহায়তায় এখন দাঁড়িয়েই এই সমস্ত কাজ করার সুব্যবস্থা রয়েছে।
এখানে বলি, বাড়ির কাজ করলে কিন্তু আখেরে শরীরেরই লাভ। বরং কাজ না করেলই অসুস্থতা মানসিকভাবে আরও চেপে বসে। তাই বাড়ির কাজ চালিয়ে যাওয়াই শ্রেয়। প্রয়োজনে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিয়ে নেওয়া যেতে পারে।
 ঘরের কাজের ফাঁকে কম সময়ে কোন কোন ব্যায়াম বা প্রাণায়াম করা যায়?
 প্রথমেই সহজ প্রাণায়মের কথা বলতে হয়। এক্ষেত্রে কাজ করতে করতে অন্তত ৫০ বার লম্বা লম্বা শ্বাস নেওয়া-ছাড়া করতে হয়। নাক দিয়ে শ্বাস নিয়ে মুখ দিয়ে ছাড়তে হবে। অথবা নাকের একপাশ থেকে শ্বাস নিয়ে অন্য পাশ থকে ছাড়ুন। এভাবে ২ থেকে ৫ মিনিট করতে পারেন। নিয়মিত অভ্যেসে ফুসফুসের কর্মক্ষমতা বাড়ে  অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে কাজ করার পর চেয়ারে বসে শ্বাস নিতে নিতে পা দু’টিকে টানটান করে তুলে দিতে হবে। এরপর কিছুক্ষণ সেই অবস্থায় থেকে শ্বাস ছাড়তে ছাড়তে পা দু’টিকে নামিয়ে আনুন। এভাবে ১০ বার করা যায়। এই ব্যায়াম করলে পায়ের ব্যথা কমে
 চেয়ারে বসে শ্বাস নিতে নিতে হাত দু’টিকে শরীরের দু’পাশ বরাবর লম্বা টানটান করে ওপরে তুলে দিন। এরপর মাথার উপর হাত দু’টিকে তালি মারার ভঙ্গিতে জোড়া করে শ্বাস ছাড়তে ছাড়তে নীচে নামিয়ে আনুন। এই পদ্ধতিতে ৫ থেকে ১০ বার করুন। নিয়মিত অভ্যেস করলে কাধের ব্যথা কমবে
 চেয়ারে বসে হাত দু’টিকে মাটির সঙ্গে সমান্তরাল অবস্থায় সামনের দিকে সোজাসুজি এগিয়ে আনুন। তারপর দু’টি হাত মুঠো করে করতাল বাজানোর ভঙ্গিতে জোড়া করতে হবে। এবার শ্বাস টানতে টানতে হাত দু’টিকে একে অপরের থেকে আলাদা করে যতটা সম্ভব পিছিয়ে নিয়ে আসুন। আবার শ্বাস ছাড়঩তে ছাড়তে হাত দু’টিকে আগের মতো জোড়া করে দিতে হবে। এভাবে দিনে ৫ থেকে ১০ বার করা যায়।
মন্তব্য
Loading...